বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীসমাজের ভূমিকা বাংলা রচনা
![]() |
| অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নারীসমাজ | ছবি সংগ্রহঃ Gemini |
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নারীসমাজ
জেন্ডার সমতা ও নারী ক্ষমতায়নের ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে নারীদের এই অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে আরও উৎসাহিত করা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া জরুরি।
ভুমিকা
সভ্যতার আদিতে মানুষ যখন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেছিল এবং উৎপাদনশীল কর্মকান্ড জড়িত হয়েছিল তখন নারীর ভূমিকাই ছিল অগ্রণী । বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীসমাজের ভূমিকা অনেক এগিয়ে আছে। কৃষিকেন্দ্রিক বর্তমান সমাজে নারীই ছিল উৎপাদনের মূলশক্তি এবং আথিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব।কালের বির্বতেন শিল্প বিপ্লবের অভিঘাতে উৎপাদন ব্যবস্থায় অমূল পরিবর্তন আসে যা উন্নয়নের অগ্রগতি করে। নারী ছিটকে পড়ে উৎপাদনশীল কর্মকান্ডে স্রোতধারা থেকে। সামগ্রিক অর্কনীতিতে কৃষিক অবদান হ্রাস পাওয়া ছাড়াও সমাজের ওপর পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ পতিষ্ঠার পর নারীরা ধীরে ধীরে গৃহীমুখী হয়ে পড়ল। অবশ্য আধুনিককালে নারীরা আবারও আত্নবিকাশের ধারার পুরুষের সমান্তরালে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে।
অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অবদান
দেশের মোট জনশক্তির অধেকই নারী। দেশে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড তথা উৎপাদন ও সেবার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা পুরুষের চেয়ে কম নয়। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সাথে নারী সমাজকে যত বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রয়াস তত সফল হবে। নারীরা সমাজে যেসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখে চলেছে তার কয়েকটি দিক নিম্নে চিহ্নিত করা হলো-
অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীসমাজের
১. তৈরি পোশাক শিল্প ও রপ্তানি আয় (RMG Sector)
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত 'তৈরি পোশাক শিল্পে' নিয়োজিত শ্রমিকের সিংহভাগই নারী। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে নারীরা জাতীয় আয় (GDP) বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছেন।
২. গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি খাত
আমাদের নারীরা উৎপাদনশীল কজে যেমনঃ বীজ সংরক্ষণ, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন এবং সবজি চাষে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। নারীসমাজ খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রেখে । নারীরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
৩. নারী উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি (SME, F-Commerce)
দেশে নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ দখল করে আছে, যারা হস্তশিল্প, কুটির শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নারীসমাজ এখন তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ঘরে বসেই হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের অবদান অনেক।
৪. ক্ষুদ্রঋণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Microfinance)
গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাকসহ নানা এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ সুবিধার মূল সুবিধাভোগী নারীরা। দরিদ্রতা বিমোচন নারী ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নারীরা পরিবারে স্বচ্ছলতা আনছেন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছেন।
৫. প্রবাসী আয় (Remittance) ও সেবা খাত
বৈদেশিক কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, কর্পোরেট ও সরকারি প্রশাসনে নারীদের অংশগ্রহণ দেশের সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গৃহস্থালির কাজে
আমাদের দেশে গৃহস্থালির কাজকমে নারীরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। রান্নাবান্না, ঘর-দোর, কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করাসহ গৃহব্যবস্থাপনার ষোল আনাই নারীর ওপর নির্ভরশীল। সন্তান লালন-পালন ও পরিচর্যায় মায়ের বিকল্প নেই। শুধু তাই নয়, পরিবারের উপার্জিত অর্থের সুষ্ঠ ব্যয় ও চাহিদা পূরণের কাটিও আমাদের নারীরাই করে থাকে।
নারীসমাজ কৃষিক্ষেত্রে
ঐতিহ্য অনুযায়ী আমাদের গৃহস্থরা মাঠে ফসল রোপণ-রোপণ, মাড়াই ও কর্তনের কাজটি করে থাকে। তবে উপজাতীয় এবং স্ফটিকবিশেষ গ্রামীণ এলাকার অনেক পরিবারেই নারীরা মাঠের কাজে অংশ নেয়। এছাড়া ফসল মাড়াই, প্রক্রিয়াকরণ, গোলাজাতকরণ ও সংরক্ষণের কাজগুলো প্রধানত মেয়েরাই করে থাকে। সার্বিকভাবে প্রত্যক্ষ কৃষিকর্মের পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে মেয়েদের অবদানও কম নয়। কেননা, শস্যকে খাদ্যোপযোগী করার সকল প্রক্রিয়ার কাজ সাধারণত নারীরা করে থাকে।
গৃহকেন্দ্রিক পশুপাখি পালন
বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামীণ বাড়িতে হাঁস-মুরগি প্রতিপালিত হয়। এগুলো থেকে প্রাপ্ত ডিম ও মাংস পরিবারের আমিষের চাহিদা পূরণ করে থাকে। অনেক সময় হাঁস-মুরগি বিক্রি করে পরিবারের অভাব মোচন করা হয়। গবাদি পশুর লালন-পালন, দুধ দোহন ও বিক্রি মেয়েরাই করে থাকে। গৃহকেন্দ্রিক এ পশুপাখি পালন থেকে জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে অথচ অনূঢ় তার স্বীকৃতি আজ পর্যন্ত হয় নি।
নারীদের কুটির শিল্পে অবদান
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের মূল চালিকাশক্তি নারী। মৃৎ শিল্প, বাঁশ-বেত শিল্প, মৃড়ি শিল্প, হেক্কাবানা প্রভৃতি মেয়েদের হাতেই মূল উৎপাদন ক্ষমতা। অনেক ক্ষেত্রে পটের মূল উৎপাদকের ভূমিকা পালন করে মেয়েরা, আর পণ্য বাজারজাতকরণের ভূমিকায় থাকে পুরুষ। তাঁত শিল্পে মেয়েদের অবদান অসামান্য। উপজাতীয় মেয়েরা নিজ হাতে তাদের কাপড় তৈরি করে। এছাড়া আজকাল শৌখিন ও দর্শনীয় পণ্য মেয়েরা ঘরে বসেই উৎপাদন করে থাকে।
তৈরি পোশাক শিল্পে
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি তথা তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৫৭ ভাগই আসে এ শিল্প থেকে। এ শিল্পে নিয়োজিত ১৮ লক্ষ শ্রমিকের শতকরা ৮৫ থেকে ৯০ ভাগই মহিলা। এই বিপুল সংখ্যক মহিলা শ্রমিকের নিরন্তর শ্রমেই বাংলাদেশকে আজ উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়েছে।
নারীসমাজ উৎপাদনমুখী শিল্পখাতে
সম্প্রতি গঠিত রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের অধিকাংশ শিল্প কারখানাতেই নারী শ্রমিকদের সংখ্যা অধিক। তাছাড়া প্যাকেটজাত, ওষুধ, বয়ণ ও খাদ্য শিল্পে নারীরা পুরুষের চেয়ে অধিকতর দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। যেকোনো হালকা শিল্পে মেয়াদী পুরুষের চেয়ে অধিকতর উৎপাদন সহায়ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
সেবা খাতে উন্নয়নে নারীসমাজ
আমাদের সেবা খাতের কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নারীদের উপযোগিতা অপরিহার্য। চিকিৎসা সেবায় নারীদের বিকল্প নেই। এছাড়া হোটেল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আকাশ পরিবহন, কর্পোরেট অফিস প্রভৃতি ক্ষেত্রে মেয়েরা তাদের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছে। এছাড়াও তথ্য যোগাযোগ ও বিনোদন খাতে আজকের আধুনিক নারীদের অবদান অনস্বীকার্য।
বস্ত্র ও ফ্যাশন শিল্পে
আধুনিককালে ফ্যাশন সচেতন মানুষের জন্য নিত্য নতুন রূপ ফ্যাশনের পোশাক ডিজাইন ও তৈরির কাজে ব্যাপকভাবে মেয়েরা অংশগ্রহণ করছে। আজকাল উদ্যোগী মেয়েরা অনেক ফ্যাশন হাউস পরিচালনা করছে। তাছাড়া বিউটি পার্লার, রূপায়ন শিল্প, সেলাই প্রশিক্ষণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে মেয়েদের অবদান একচ্ছত্র। এছাড়াও আজকাল বিউটি বিউটিশিয়ান হিসেবে মেয়েরা কাজ করছে।
শিক্ষা ও জাতি গঠনমূলক কাজে
আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার শতকরা ৭০ ভাগ শিক্ষকই মহিলা। এই ভাবে অর্থনৈতিক নারীসমাজ উন্নয়ন অংশগ্রহণ করে, তাছাড়া বিদ্যালয়ে, মহাবিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বিশেষায়িত শিক্ষায় মহিলাদের দক্ষতা ও কৃতিত্ব বিস্ময়কর। আজকাল প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত নারীরা অলংকৃত করছে। তারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক, ব্যারিস্টার এমনকি শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে জাতি গঠন মূলক কাজ করছে।
উপসংহার
আজকের বিশ্বে প্রথা ও রীতির পরিবর্তন ঘটেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নারীসমাজ অনেক পরিবর্তন ঘটেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণমূলক শ্রেণি পার্থক্যের। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি আজকাল নারী অর্থোপার্জনের জন্য বিদেশেও পাড়ি জমাচ্ছে। আমরা যদি আরও দ্রুত উন্নতি অর্জন করতে চাই এবং বিশ্বের বুকে সমকক্ষ জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাই তবে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও অধিক পরিমাণে সম্পৃক্ত করতে হবে।
এই রকম আরও তথ্য পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন। এর পাশাপাশি গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন।


আপনার মূল মান মতামতটি আমাদের জানান। আমি শালীন ভাষা ব্যাবহার করবো এবং অশ্লীল ভাষা ব্যাবহার থেকে বিরত থাকবো। কৌণিক বার্তা.কম আপনার আইপি অ্যাড্রেস ব্লকের ক্ষমতা রাখে।
comment url